বাংলায়ইংরেজ শাসনের সূচনাপর্ব
প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ-বিশেষ করে বাংলা অঞ্চল ছিল ধন সম্পদে পূর্ণ রূপকথার মতো একটি দেশ।এ অঞ্চলের স্বয়ং সম্পূর্ণ গ্রাম অর্থাৎ মানুষের জীবনযাপনের জন্য যা কিছুপ্রয়োজন সবকিছুই তখনএ সব গ্রামগুলোতে পাওয়া যেত। এই স্বয়ং সম্পূর্ণ গ্রামের কৃষকদের ক্ষেত ভরা ফসল, গোলা ভরাধান, পুকুর ভরা মাছ থাকত। কুটির শিল্পেও এইগ্রামগুলো ছিল সমৃদ্ধ। তাঁতিদেরহাতে বোনা কাপড় ইউরোপের কাপড়ের চেয়েও উন্নতমানের ছিল। এর মধ্যে জগৎবিখ্যাত ছিল মসলিন কাপড়। তাছাড়া উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলও নানা ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য, মসলার জন্য বিখ্যাত ছিল।এসব পণ্যের আকর্ষণেই অনেকেই এদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে এসেছে। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও উপমহাদেশে এসেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। পরবর্তী সময়েতারা এদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতেসক্ষম হয়। এদেশে আগতঅন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে পরাজিত করে এবংস্থানীয় শাসকদের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র করেকিভাবে ইংরেজ ব্যবসায়ীকোম্পানী এ অঞ্চলে ইংরেজ শাসনের সূচনা করে-বর্তমান অধ্যায়ে সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
ইউরোপীয়দের আগমন
সাত শতক থেকেএ অঞ্চলের সঙ্গেআরব বণিকদের ব্যবসা-বাণিজ্যছিল একচেটিয়া। তারাবাণিজ্য করত মূলতসমুদ্রপথে। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দেকন্সষ্টান্টিনপোল অটোমান তুর্কীরাদখল করে নেয়।ফলে উপমহাদেশের সাথেজলপথে ব্যবসা-বাণিজ্যবন্ধ হয়ে যায়।সুতরাং প্রাচ্যের সাথেপাশ্চাত্যের ব্যবসা-বাণিজ্যেরজন্য ভিন্ন জলপথআবিষ্কারের প্রয়োজন হয়েপড়ে। মূলত একারণেই ইউরোপীয় শক্তিগুলোসমুদ্রপথে উপমহাদেশে আসারঅভিযান শুরু করে।
পর্তুগীজ
পর্তুগীজদের মধ্যে যেদুঃসাহসী নাবিক প্রথমসমুদ্রপথে এদেশে আসেনতাঁর নাম ভাস্কো-ডা-গামা।তিনি ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে২৭ মে ভারতেরপশ্চিম-উপকূলের কালিকটবন্দরে এসে উপসি'তহন। তাঁর এউপমহাদেশে আগমন ব্যবসা- বাণিজ্য এবং যোগাযোগক্ষেত্রে এক নতুনযুগের সূচনা করে।
পর্তুগীজরা ব্যবসা-বাণিজ্যকেমূলধন করে এদেশেআসলে ক্রমে ক্রমেতারা সাম্রাজ্য বিস্তারেরদিকে ঝুঁকে পড়ে।স্বল্প সময়ের মধ্যেএই ইউরোপীয় বণিকরাউপমহাদেশের পশ্চিম উপকূলেরকালিকট, চৌল, বোম্বাই, সালসেটি, বেসিন, কোচিন, গোয়া, দমন, দিউপ্রভৃতি বন্দরে কুঠিস্থাপন করতে সক্ষমহয়। ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দেতারা চট্টগ্রাম ওসাতগাঁওয়ে শুল্কঘাঁটি নির্মাণেরঅনুমতি লাভ করে।১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে হুগলীনামক স্থানে তারাউপনিবেশ গড়ে তোলে।এরপর তারা উড়িষ্যাএবং বাংলার কিছুঅঞ্চলে বসতি সমপ্রসারিতকরতে সক্ষম হয়।বাংলাসহ উপমহাদেশের বিভিন্নঅঞ্চলে বাণিজ্য কুঠিনির্মাণের ব্যাপারে অগ্রণীভূমিকা থাকলেও পর্তুগীজদেরবিভিন্ন অপকর্ম ওদস্যুতার কারণে বাংলারসুবেদার শায়েস্তা খানতাদের চট্টগ্রাম ওসন্দ্বীপের ঘাঁটি দখলকরে বাংলা থেকেবিতাড়ন করেন। তাছাড়াপর্তুগীজরা এদেশে আগতঅন্যান্য ইউরোপীয় শক্তিরসঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বীতায় পরাজিতহয়। ফলে এরাএ দেশ ত্যাগকরতে বাধ্য হয়।
ওলন্দাজ বাডাচ
হল্যান্ডের অধিবাসী ওলন্দাজবা ডাচরা ‘ডাচইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ গঠন করে বাণিজ্যিরউদ্দেশে ১৬০২ খ্রিস্টাব্দেএই উপমহাদেশে আসে।ভারতবর্ষে তারা কোম্পানিরসনদ অনুযায়ী কালিকট, নাগাপট্টম বাংলার চুঁচুড়াও বাকুড়ায় বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে।তাছাড়া বলাসোর কাশিমবাজারএবং বরানগরেও তারাকুঠি স্থাপন করে।ওলন্দাজ ও অপরইউরোপীয় শক্তি ইংরেজদেরমধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যনিয়ে বিরোধ শুরুহয় এবং একইসঙ্গে বাংলার শাসকদেরসঙ্গে তারা বিরোধেজড়িয়ে পড়ে। ১৭৫৯খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত বিদারারযুদ্ধে তারা ইংরেজদেরকাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিতহয়। ফলে ১৮০৫খ্রিস্টাব্দে তারা সকলবাণিজ্য কেন্দ্র গুটিয়েভারতবর্ষ ত্যাগ করতেবাধ্য হয়। প্রথমেপতুর্গীজ পরে ওলন্দাজশক্তির পতন, ভারতেইংরেজ শক্তির উত্থানেরপথ সুগম করে।
দিনেমার
দিনেমার বা ডেনমার্কেরঅধিবাসী একদল বণিকবাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে‘ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়াকোম্পানি’ গঠন করেন।১৬২০ খ্রিস্টাব্দে তারাদক্ষিণ ভারতের তাঞ্জোরজেলায় ত্রিবাঙ্কুর এবং১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলারশ্রীরামপুরে বাণিজ্য কুঠিস্থাপন করেন। কিন্তুএদেশে তারা লাভজনকব্যবসা করতে ব্যর্থহয়। ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দেইংরেজদের কাছে বাণিজ্যকুঠি বিক্রি করেকোনো রকম বাণিজ্যিকসফলতা ছাড়াই দিনেমাররাএদেশ ত্যাগ করে।
ইংরেজ
সমুদ্রপথে ইউরোপীয় বণিকদেরসাফল্য, প্রাচ্যের ধন-সম্পদেরপ্রাচুর্য, ইংরেজ বণিকদেরকেওএ অঞ্চলে ব্যবসাবাণিজ্যে উৎসাহিত করে।এই উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডেরএকদল বণিক ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি নামেএকটি বণিক সংঘগড়ে তোলে। বণিকসংঘটি ১৬০০ খ্রিস্টাব্দেরাণী এলিজাবেথের কাছথেকে ১৫ বছরমেয়াদি প্রাচ্যে একচেটিয়াবাণিজ্য করার সনদপত্রলাভ করে। এইসনদপত্র নিয়ে কোম্পানিরপ্রতিনিধি বাণিজ্যিক সুবিধালাভের আশায় আকবরেরদরবারে হাজির হন।এরপর ক্যাপ্টেন হকিন্স১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে জেমসেরসুপারিশপত্র নিয়ে বাণিজ্যসমপ্রসারণের লক্ষ্যে সম্রাটজাহাঙ্গীরের সঙ্গে সাক্ষাৎকরেন। তাঁর অনুমতিনিয়ে ১৬১২ খ্রিস্টাব্দেসুরাটে বাণিজ্য কুঠিস্থাপিত হয়। পরবর্তীকালে১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথমজেমসের দূত হয়েজাহাঙ্গীরের দরবারে আসেনস্যার টমাস রো।সম্রাটের কাছ থেকেতিনি ইংরেজদের জন্যবাণিজ্যিক সুবিধা আদায়করে নেন। ১৬১৯খ্রিঃ তিনি ভারতবর্ষত্যাগ করেন। ইতোমধ্যেকোম্পানি সুরাট আগ্রা, আহমদাবাদ প্রভৃতি স্থানেবাণিজ্য কুঠি স্থাপনকরে তাদের ভিত্তিমজবুত করে ফেলে।
কোম্পানি তার দ্বিতীয়বাণিজ্য কুঠি স্থাপনকরে মসলিমপট্টমে। এরপরবাংলার বালাসোরে আরেকটিবাণিজ্য কুঠি স্থাপনকরে। এদের শক্তিক্রমশ বৃদ্ধি পেতেথাকলে এরা করমণ্ডল(মাদ্রাসা শহর) উপকূলেএকটি দুর্গ নির্মাণকরতে সক্ষম হয়।বাংলার সুবেদার শাহসুজার অনুমোদন লাভকরে তারা ১৬৫৮খ্রিস্টাব্দে হুগলিতে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে।এভাবে কোম্পানি কাশিমবাজার, ঢাকা, মালদহেও বাণিজ্যকুঠি নির্মাণ করে।
১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডেররাজা দ্বিতীয় চার্লসপর্তুগীজ রাজকন্যা ক্যাথরিনেরসঙ্গে বিয়ের যৌতুকহিসেবে লাভ করেনবোম্বাই শহর। অর্থাভাবেচার্লস ইস্ট ইন্ডিয়াকোম্পানির কাছে পঞ্চাশহাজার পাউন্ডের বিনিময়েশহরটি বিক্রি করেদেন। পরবর্তীকালে এইবোম্বাই শহরই কোম্পানিরপ্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রেপরিণত হয়।
জব চার্ণক নামেআরেকজন ইংরেজ ১৬৯০খ্রিস্টাব্দে ১২০০ টাকারবিনিময়ে কোলকাতা, সুতানটিও গোবিন্দপুর নামেতিনটি গ্রামের জমিদারীস্বত্ত্ব লাভ করেন।ভাগীরথী নদীর তীরেরএই তিনটি গ্রামকেকেন্দ্র করেই পরবর্তীকালেকোলকাতা নগরীর জন্মহয়। এখানেই কোম্পানি১৭০০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডেররাজা তৃতীয় উইলিয়ামেরনাম অনুসারে ফোর্টউইলিয়াম দুর্গ নির্মাণকরে। ধীরে ধীরেএটি ইংরেজদের বাণিজ্যিকস্বার্থ রক্ষা এবংরাজনৈতিক স্বার্থ বিস্তারেরশক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণতহয়।
ইংরেজ কোম্পানির ক্ষমতাআরো বৃদ্ধি পায়যখন দিল্লির সম্রাটফারুখশিয়ার তাদের বাংলা, বোম্বাই ও মাদ্রাজেবিনা শুল্কে বাণিজ্যেরঅধিকার প্রদান করেন।একই সঙ্গে নিজস্বমুদ্রা প্রচলনের অধিকারওকোম্পানি লাভ করে।সম্রাটের এই ফরমানকেইংরেজ ঐতিহাসিক ওরমেইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরমহাসনদ বা ম্যাগনাকার্টা বলে উলে- করেন। এইখ অধিকারলাভ করে ইংরেজইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিঅপ্রতিরুদ্ধ গতিতে অগ্রসরহতে থাকে।
ফরাসী
উপমহাদেশে সর্বশেষে আগতইউরোপীয় বণিক কোম্পানিহচ্ছে ফরাসী ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৬৬৪খ্রিস্টাব্দে এই বাণিজ্যিককোম্পানি গঠিত হয়।১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানিসর্বপ্রথম সুরাট এবংপরের বছর মুসলিমপট্টমেবাণিজ্য কুঠি স্থাপনকরেন। ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দেপন্ডিচেরীতে ফরাসী উপনিবেশগড়ে ওঠে।
১৬৭৪ খ্রিঃ পরথেকে তারা তাদেরবাণিজ্যিক কার্যক্রম বাংলায়সমপ্রসারিত করে। কোম্পানিরবাংলার সুবাদার শায়েস্তাখানের কাছ থেকেগঙ্গা নদীর তীরেঅবসি'ত চন্দননগরনামক স্থানটি কিনেনেয়। ১৬৯০ থেকে১৬৯২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেচন্দননগর একটি শক্তিশালীসুরক্ষিত ফরাসী বাণিজ্যকুঠিতে পরিণত হয়।১৬৯৬ খ্রিঃ কোম্পানিএখানে একটি শক্তিশালীদুর্গ স্থাপন করতেসক্ষম হয়। নির্দিষ্টহারে শুল্ক প্রদানেরশর্তে ১৬৯৩ খ্রি: ফরাসীর বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার বাণিজ্য করারঅধিকার লাভ করে।পরবর্তীকালে তারা কাশিমবাজারবালাসোরে কুঠি স্থাপনকরতে সক্ষম হয়।
ইংরেজ বণিকরা যখনব্যবসা বাণিজ্যে দৃঢ়অবস্থানে তখন ফরাসীরাএদেশে আসে। এঅবস্থায় ইংরেজদের সঙ্গেপ্রতিযোগিতায় টিকে থাকাতাদের জন্য কঠিনহয়ে দাঁড়ায়। কারণঅন্যান্য ইউরোপীয় শক্তিরমতো ফরাসীরাও এদেশেসম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্নদেখতে থাকে। ফলেদুই ইউরোপীয় শক্তি- ইংরেজ ও ফরাসীদেরমধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্যহয়ে দাঁড়ায়।
ইংরেজদের ষড়যন্ত্র, কূটকৌশল, উন্নত রণ কৌশলেরকাছে ফরাসীরা পরাজিতহয়। বাংলার নবাবেরপক্ষ অবলম্বন করায়১৭৫৭ খ্রিঃ পলাশীরযুদ্ধে ইংরেজদের সাফল্যতাদেরকে আরও পর্যুদস্তকরে ফেলে। ফলেবাংলার ফরাসী কুঠিগুলোইংরেজদের দখলে চলেযায়। দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটকেরযুদ্ধসমূহে ফরাসী কোম্পানিপরাজিত হলে তারাএদেশ ত্যাগ করে।ফলে ইংরেজরা ভারতবর্ষেঅপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণতহয়।
পলাশীযুদ্ধ
১৭৪০ থেকে ১৭৫৬খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আলীবর্দীখান বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব ছিলেন।প্রতিকূল পরিসি'তিতেওতিনি সফলভাবে রাজ্যশাসন করেছেন। তিনিতাঁর সময়ে মারাঠাও বর্গীদের দমনকরে রাখতে সফলহন। সুকৌশলে ইংরেজবণিক কোম্পানিকেও নিয়ন্ত্রণেরেখেছিলেন। কিন্তু তাঁরমৃত্যুর পর বাংলাররাজনীতিতে চরম বিশৃঙ্খলাদেখা দেয়।
নবাব মৃত্যুর আগেতাঁর কনিষ্ঠ কন্যাআমেনা বেগমের পুত্রসিরাজউদ্দৌলাকে বাংলার সিংহাসনেরউত্তরাধিকার মনোনীত করেযান। ১৭৫৬ খ্রিঃআলীবর্দী খানের মৃত্যুহলে তাঁর প্রিয়দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা ২২বছর বয়সে নবাবেরক্ষমতা গ্রহণ করেন।সিংহাসনে বসার পরথেকে তাকে নানামুখীষড়যন্ত্র ও সমস্যারমোকাবেলা করতে হয়।তাঁর প্রথম সমস্যাছিল তাঁর পরিবারেঘনিষ্ঠজনদের ষড়যন্ত্র। বিশেষকরে আলীবর্দী খানেরতিন কন্যার মধ্যেজ্যেষ্ঠ কন্যা ঘষেটিবেগম সিরাজের নবাবহওয়ায় আশাহত হয়েনবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রেলিপ্ত হন। এদেরসঙ্গে যোগ দেনঘাষেটি বেগমের দেওয়ানরাজা রাজবল্লভ , পূর্ণিয়ারশাসনকর্তা সিরাজের খালাতোভাই শওকত জঙ্গএবং অন্যান্যরা। কৌশলেনবাবভ ঘষেটি বেগমকেনজরবন্দী করেন। পূর্ণিয়ারশাসনকর্তা শওকত জঙ্গবিদ্রোহী হয়ে উঠলেসিরাজউদ্দৌলা এক যুদ্ধেতাকে পরাজিত ওনিহত করে পূর্ণিয়াদখল করে নেন।
নবাব পারিবারিক ষড়যন্ত্রকৌশলে দমন করলেওতাঁর বিরুদ্ধে বাইরেষড়যন্ত্রের আরেক জালবিস-ৃতহতে থাকে। এরসঙ্গে জড়িত হয়দেশি-বিদেশি বণিকশ্রেণি, নবাবের দরবারেরপ্রভাবশালী রাজন্যবর্গ ওঅভিজাত শ্রেণি, নবাবেরসেনাপতি মীর জাফরসহআরো অনেকে। প্রত্যেকেযার যার স্বার্থউদ্ধারের জন্য নবাবেরবিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরুকরে। এই ষড়যন্ত্রকারীরা পলাশী যুদ্ধেরপটভূমি তৈরি করতেথাকে।
পলাশী যুদ্ধের কারণ
ইতিহাসের যেসব ঘটনাএকটি দেশের জনগণেরভাগ্যে ভয়াবহ বিপর্যয়ঘটাতে পারে, পলাশীরযুদ্ধ এ অঞ্চলেরজনগণের জন্য তেমনিএক ঘটনা ছিল।এই ঘটনার পেছনেরকারণগুলো নিম্নে উলে- করা হলো।
- প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ইংরেজরা সিরাজউদৌলা বাংলার সিংহাসনে বসারা পর নতুন নবাবকে কোনো উপঢৌকন পাঠায়নি এবং কোনো সৌজন্যমূলক সাক্ষাতও করেনি। ইংরেজদের এই বেয়াদবিতে নবাব ক্ষুব্ধ হন।
- নবাবের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ অব্যাহত রাখে।
- ইংরেজ কোম্পানি দস্তকের অপব্যবহার করলে দেশীয় বণিকরা ক্ষতিগ্রসত হতে থাকে। নবাব দস্তকের অপব্যবহার করতে নিষেধ করেন এবং বাণিজ্যিক শর্ত মেনে চলার আদেশ দেন। কোম্পানি নবাবের সে আদেশও অগ্রাহ্য করে।
- আলীবর্দী খানের সঙ্গে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ইংরেজরা নবাবকে কর দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাছাড়া জনগণকে নির্যাতন করার মতো ধৃষ্টতাও তারা দেখাতে থাকে।
- রাজা রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস তার পরিবারের সদস্যদেরসহ প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে কোলকাতায় ইংরেজদের কাছে আশ্রয় নেয়। তাকে ফেরত দেয়ার জন্য নবাব ইংরেজদের নিকট দূত পাঠান। ইংরেজ গভর্নর নবাবের দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। এর আগে শওকত জঙ্গের বিদ্রোহের সময়ও ইংরেজরা নবাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়।
ইংরেজদের একের পরএক ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, অবাধ্যতা নবাবকে ক্ষুব্ধকরে তোলে। তাদেরউপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ারজন্য ১৭৫৬ খ্রিঃজুন মাসের শুরুতেনবাব কোলকাতা দখলকরে নেন। যাত্রাপথে তিনি কাশিমবাজার কুঠিও দখলকরেন। নবাবের অতর্কিতআক্রমণে ইংরেজরা ফোর্টউইলিয়াম দুর্গ ত্যাগকরে পালিয়ে যায়।হলওয়েলসহ বেশকিছু ইংরেজআত্মসমর্পণ করতে বাধ্যহন। বন্দিদশা থেকেমুক্তি পেয়ে নবাবকেহেয় করার জন্যহলওয়েল এক মিথ্যাকাহিনীর প্রচারণা চালায়যা ইতিহাসে ‘অন্ধকূপহত্যা’ নামে পরিচিত।এতে বলা হয়যে, ১৮ ফুট দৈর্ঘ্য১৪.১০ফুট প্রস' ছোটএকটি ঘরে ১৪৬জন ইংরেজকে বন্দিকরে রাখা হয়।এতে প্রচণ্ড গরমেশাসরুদ্ধ হয়ে ১২৩জনের মৃত্যু হয়।এই মিথ্যা প্রচারমাদ্রাজ পর্যন্ত পৌঁছেযায়। ফলে উত্তেজিতহয়ে কোলকাতা দখলকরার জন্য ওয়াটসনও ক্লাইভ মাদ্রাজথেকে কোলকাতায় চলেআসে। তারা নবাবেরসেনাপতি মানিকচাঁদকে পরাজিতকরে কোলকাতা দখলকরে নেয়। নবাবতাঁর চারদিকে ষড়যন্ত্রও শত্রু পরিবেষ্টিতটের পেয়ে ইংরেজদেরসঙ্গে নতজানু ওঅপমানজনক সন্ধি করতেবাধ্য হন। ইহাইতিহাসে আলীনগর সন্ধিনামে খ্যাত।
আলীনগর সন্ধিতে সবধরনেরসুযোগ-সুবিধা পাওয়ারপর ক্লাইভের উচ্চাকাঙ্খাআরো বৃদ্ধি পায়।নবাবের দুর্বলতার সুযোগনিয়ে ইউরোপে সংঘটিতসপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের অজুহাতেইংরেজরা ফরাসীদের চন্দনগরকুঠি দখল করেনেয়। নবাব এঅবস্থায় ফরাসীদের সঙ্গেমৈত্রী স্থাপন করেইংরেজদের শায়েস্তা করারব্যবস্থা নেন। এতেক্লাইভ ক্ষুব্ধ হয়েনবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করারষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।এই ষড়যন্ত্রে ক্লাইভেরসঙ্গে যুক্ত হয়ব্যবসায়ী ধনকুবের জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ, রাজারাজবল্লভ সেনাপতিরভ মীরজাফরপ্রমুখ।
পলাশীরযুদ্ধের ঘটনা
পলাশীর যুদ্ধ বাংলাতথা এ উপমহাদেশেরজন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণঐতিহাসিক ঘটনা। ১৭৫৭খ্রিঃ ২৩ জুনভগীরথী নদীর তীরেপলাশীর আমবাগানে এযুদ্ধ সংঘটিত হয়।ইতোমধ্যে রবার্ট ক্লাইভতার অবস্থান সুদৃঢ়করে সন্ধিভঙ্গের অজুহাতেসিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করে। নবাবেরপক্ষে দেশপ্রেমিক মীরমদন, মোহন লাল এবংফরাসী সেনাপতি সিনফ্রে প্রাণপণ যুদ্ধকরেন। যুদ্ধে মীরমদননিহত হন। নবাবেরবিজয় আসন্ন জেনেমীরজাফর ষড়যন্ত্রমূলকভাবে যুদ্ধথামিয়ে দেয়। মীরমদনের মৃত্যু ওমীরজাফরের অসহোযোগিতা নবাবকেবিচলিত করে।
নবাবের সেনাপতি মীরজাফরযুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অসহযোগিতাকরে নীরব দর্শকেরভূমিকায় ছিল। নবাবকোরআন স্পর্শ করিয়েশপথ নেয়ালেও মীরজাফরেরষড়যন্ত্র থামেনি। নবাবেরসৈন্যরা যখন বিশ্রামনিচ্ছে সেই সময়মীরজাফরের ইঙ্গিতে ইংরেজসৈন্যরা তাদের উপরঝাপিয়ে পড়ে। যারঅনিবার্য পরিণতি নবাবেরপরাজয়।
নবাবের পতনেরকারণ
- নবাবের সেনাপতি মীরজাফর ও তার সহযোগীদের যুদ্ধক্ষেত্রে অসহোযোগিতা ও বিশ্বাসঘাতকতা।
- নবাবের সেনাপতি থেকে সভাসদ পর্যন্ত সবাই দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে, ব্যক্তি স্বার্থকে বড় করে দেখেছে।
- তরুণ নবাবের অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তার অভাব ছিল। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্তগ্রহণে ব্যর্থতার পরিচয় দেন।
- সেনাপতি মীরফাজরের ষড়যন্ত্রের কথা জানা সত্ত্বেও তিনি বার বার তার উপরই নির্ভর করেছেন।
- ইংরেজদের সম্পর্কে সতর্কতা, ফরাসী এবং ইংরেজদের ষড়যন্ত্র এসব বিষয়ে আলীবর্দী খানের উপদেশ সিরাজউদ্দৌলার কাছে গুরুত্ব পায়নি।
- নবাবের শত্রু পক্ষ ছিল ঐক্যবদ্ধ এবং রণকৌশল ছিল উন্নততর।
- রবার্ট ক্লাইভ ছিল দূরদর্শী, সুক্ষ্ম ও কূট বুদ্ধিসম্পন্ন।
পলাশী যুদ্ধের ফলাফল
- সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও মৃত্যু বাংলায় প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের পথ সুগম করে।
- যুদ্ধের ফলে মীরজাফরকে বাংলার সিংহাসনে আরোহণে বসালেও তিনি ছিলেন নামেমাত্র নবাব, প্রকৃত ক্ষমতাছিল রবার্ট ক্লাইভের হাতে।
- পলাশী যুদ্ধের ফলে ইংরেজরা বাংলায় একচেটিয়া ব্যবসা বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। ফরাসীরা এদেশ থেকেবিদায় নিতে বাধ্য হয়।
- এ যুদ্ধের পর ইংরেজ শক্তির স্বার্থে এদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবর্তন সংঘটিত হতে থাকে।
- পলাশী যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী পরিণতি ছিল সমগ্র উপমহাদেশে কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠা। এভাবেই এ যুদ্ধের ফলেবাংলার তথা ভারতের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয়।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছেযে, পলাশীর যুদ্ধ একটিখণ্ডযুদ্ধ হলেও বাংলাতথা উপমহাদেশর রাজনীতিতেএর গুরুত্ব অপরিসীম।
বক্সারের যুদ্ধ(১৭৬৪)
ইংরেজবণিক কোম্পানি মীরজাফরকে যে উদ্দেশেসিংহাসনে বসিয়েছিল তাদেরসে উদ্দেশ্য সফলহয়নি। নতুন নবাবকোম্পানির প্রাপ্য অর্থপ্রদানে ব্যর্থ হয়েদেউলিয়া হয়ে পড়ে।নিজের ক্ষমতা রক্ষাকরতেও তাকে বারবার ক্লাইভের উপরনির্ভর করতে হয়।আবার ক্লাইভের রাজকার্যেঘন ঘন হস্তক্ষেপনবাবের পছন্দ ছিলনা। ইংরেজদের বিতাড়নেরজন্য মীর জাফরআরেক বিদেশি কোম্পানিওলান্দাজদের সাথে আঁতাতকরে। বিষয়টি ইংরেজদেরদৃষ্টি এড়ায়নি। মীরজাফরের বিরুদ্ধে অযোগ্যতা, অতিরিক্ত অর্থ প্রদানেঅক্ষমতা এবং ওলন্দাজদেরসঙ্গে আঁতাতের অভিযোগেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করাহয়। ১৭৬০ খ্রিঃইংরেজ গভর্নর ভান্সিটার্টমীরজাফরকে ক্ষমতা থেকেসরিয়ে মীর কাশিমকেশর্ত সাপেক্ষে সিংহাসনেবসান। মীর কাশিমেরস্বাধীন নবাব হিসেবেটিকে থাকার ইচ্ছারকারণে মূলত বক্সারেরযুদ্ধ সংঘটিত হয়।
বক্সারের যুদ্ধের কারণ :
মীর কাশিম একজনসুদক্ষ শাসক, দূরদর্শীরাজনীতিবিদ ও স্বাধীনচেতামানুষ ছিলেন। তিনিতাঁর প্রজাদের কল্যাণেরপ্রতি সচেতন ছিলেন।তিনি চেয়েছিলেন ইংরেজদেরসঙ্গে সম্মানজনক উপায়েবাংলার স্বার্থ রক্ষাকরে আর্থিক ওসামরিক দুর্বলতা কাটিয়েউঠতে। এ উদ্দেশেতাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলাইশেষ পর্যন্ত বক্সারেরযুদ্ধের কারণ হয়েদাঁড়ায়।
- মীর কাশেম প্রথমে ইংরেজদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপবন্ধ এবং প্রশাসনকে প্রভাবমুক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এ উদ্দেশে তিনি রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গের স্থানান্তরিত করেন। নিরাপত্তার জন্য দুর্গ নির্মাণ ও রাজধানীর চারদিকে পরিখা খনন করেন।
- ইংরেজদের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করা এবং সৈনিকদের ইউরোপীয় সামরিক পদ্ধতি শিক্ষাদানের জন্য দুজন ইউরোপীয় সৈনিককে প্রশিক্ষক হিসেবে রাখেন।
- অস্ত্র-গোলাবারুদের জন্য যাতে কারো মুখাপেক্ষী হতে না হয় সেজন্য রাজধানীতে কামান, বন্দুক ইত্যাদি তৈরির ব্যবস্থা নেন।
- বিহারের শাসনকর্তা রামনারায়ণ ইংরেজদের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখালে তাকে পদচ্যুত ও তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
- ১৭১৭ খ্রিঃ মুঘল সম্রাটের ফরমানে ইংরেজদের ব্যবসা করার যে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল তারা তার অপব্যবহার করা শুরু করে। ‘দস্তক’ নামের ছাড়পত্রের অপব্যবহারের ফলে দেশি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস' হতে থাকে। ফলে, নবাব সবার জন্য এক ব্যবস্থা গ্রহণ করে আন্তঃবাণিজ্যে সকল শুল্ক উঠিয়ে দেন। ফলে ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের একচেটিয়া লাভজনক ব্যবসায় অসুবিধা হয়। এ বিষয়ে নবাব কোনোরকম আপোষ করতে না চাইলে ইংরেজদের সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে।
- নবাবের সকল পদক্ষেপ ছিল দেশ ও জনগণের স্বার্থে, কিন্তু ইংরেজ স্বার্থবিরোধী। ফলে ক্ষুব্ধ ইংরেজরা এর প্রতিকারের জন্য প্রস'ত হচ্ছিল।
- ১৭৬৩ খ্রিঃ ক্ষুব্ধ হয়ে পাটনা কুঠির অধ্যক্ষ এলিস পাটনা আক্রমণ করে দখল করে নেয়। ফলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা ছাড়া নবাবের আর কোনো উপায় থাকে না। মীর কাশিম সফল প্রতিরোধের মাধ্যমে এলিসকে পাটনা থেকে বিতাড়িত করেন। ১৭৬৩ খ্রিঃ কোলকাতা কাউন্সিল নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। মেজর এডামসের নেতৃত্বে প্রেরিত ইংরেজ বাহিনীর কাছে গিরিয়া, কাটোয়া ও উদয়নালার যুদ্ধে নবাব শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।
ইতোমধ্যে ইংরেজরা মীরজাফরকে পুনরায় বাংলারসিংহাসনে বসায়। মীরকাশিম পরাজিত হয়েওহতাশ হননি। নবাবইংরেজদের মোকাবেলার জন্যপ্রস'তি গ্রহণকরতে থাকেন। তিনিঅযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলাএবং মুঘল সম্রাটশাহ আলমের সঙ্গেএকত্রিত হয়ে ১৭৬৪খ্রি: বিহারের বক্সারনামক স্থানে ইংরেজদেরবিরুদ্ধে চরম শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হন।দুর্ভাগ্যক্রমে সম্মিলিত বাহিনীমেজর মনরোর কাছেচরমভাবে পরাজিত হয়।
মীর কাশিমের পরাজয়েরকারণে বাংলার সার্বভৌমত্বউদ্ধারের শেষ চেষ্টাব্যর্থ হয়ে যায়।ইংরেজ শক্তি অপ্রতিরোধ্যগতিতে বাংলা তথাউপমহাদেশের সর্বত্র ক্ষমতারবিস্তার ঘটাতে থাকে।এ কারণে উপমহাদেশেরইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধেরচেয়ে বক্সারের যুদ্ধেরগুরুত্ব অনেক বেশি।
বক্সার যুদ্ধের ফলাফল :
এক. এ যুদ্ধের ফলেমীর কাশিমের স্বাধীনতারক্ষার শেষ চেষ্টাব্যর্থ হয়। উপমহাদেশেইংরেজদের প্রভাব প্রতিপত্তিমর্যাদা বৃদ্ধি পায়।বিনা বাধায় তারাউপমহাদেশে আধিপত্য বিস্তারেরসুযোগ লাভ করে।
দুই. এ যুদ্ধে পরাজিতহয়ে অযোধ্যার নবাবসুজাউদ্দৌলা রোহিলাখণ্ডে পালিয়েযান। দিল্লির সম্রাটশাহ আলমী ইংরেজদেরপক্ষে যোগ দেন।মীর কাশিম পরাজিতহয়ে আত্মগোপন করেন।১৭৭৭ খ্রিঃ তাঁরমৃত্যু হয়।
তিন. ইংরেজরা অযোধ্যার নবারেরকাছ থেকে কারাও এলাহাবাদ হস্তগতকরতে সক্ষম হয়।
চার. এ যুদ্ধের ফলেশুধু বাংলার নবাবইপরাজিত হননি, তাঁরমিত্র ভারত সম্রাটশাহ আলম, অযোধ্যারনবাব সুজাউদ্দৌলাও পরাজিতহন। এই তিনশক্তির একসঙ্গে পরাজয়ইংরেজদের মর্যাদা ওশক্তি বৃদ্ধি পায়।
পাঁচ. এ যুদ্ধেরফলে রবার্ট ক্লাইভদিল্লির সম্রাটের কাছথেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাবিহার উড়িষ্যার দিওয়ানীলাভী করে। ফলেবাংলায় ইংরেজ অধিকারআইনত স্বীকৃত হয়এবং তারা অসীমক্ষমতাশালী হয়ে উঠতেথাকে।
বক্সারের যুদ্ধে মীরকাশিমের পরাজয় শুধুনবাবী আমলেরই পরিসমাপ্তিঘটায়নি, মুঘল সম্রাটেরদুর্বলতাও ইংরেজদের কাছেপরিষ্কার হয়ে যায়।ফলে ঔপনিবেশিক শক্তিহিসেবে দ্রুতগতিতে ইংরেজদেরআত্মপ্রকাশ ঘটতে থাকে।
কোম্পানির দেওয়ানী লাভ
১৭৬৫ খ্রি: মীরজাফরের মৃত্যুর পরতার পুত্র নাজিম-উদ-দৌলাকেশর্ত সাপেক্ষে বাংলারসিংহাসনে বসানো হয়।শর্ত থাকে যেতিনি তার পিতারমতো ইংরেজদের নিজস্বপুরাতন দস্তক অনুযায়ীবিনা শুল্কে অবাধবাণিজ্য করতে দিবেনএবং দেশীয় বণিকদেরঅবাধ বাণিজ্যের সুবিধাবাতিল করে দিবেন।বক্সারের যুদ্ধের পরবাংলায় ইংরেজ শাসনেরপথ সুগম হয়।এ সময়ে ইংরেজকোম্পানি মুঘল সম্রাটেরকাছ থেকে বাংলাররাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণদায়িত্ব অর্থাৎ দেওয়ানীলাভ করে। ১৭৬৫খ্রিঃ দেওয়ানি লাভেরপর প্রকৃতপক্ষে ইংরেজরাইবাংলার সত্যিকার শাসকরূপেআত্মপ্রকাশ করে।
মুঘল শাসনাধীন বাংলারদেওয়ানের পদ এবংসুবেদার পদ ভিন্নভিন্ন ব্যক্তির উপরন্যস্ত ছিল। মুর্শিদকুলি খান এইপ্রথা ভঙ্গ করেদুটি পদ একাইদখল করে নেন।তাঁর সময় কেন্দ্রেনিয়মিত রাজস্ব পাঠানোহলেও পরবর্তীকালে অনেকেইতা বন্ধ করেদেন। আলীবর্দী খানেরসময় থেকে একবারেইতা বন্ধ হয়েযায়। এ অবস্থারপরিপ্রেক্ষিতে সম্রাট কোম্পানিকেবাৎসরিক উপঢৌকনের বদলেবাংলা, বিহার, উড়িষ্যারদেওয়ানী গ্রহণের অনুরোধকরেন। কিন্তু এইঅনুরোধ কোম্পানি তখনগ্রাহ্য করেনি। কিন্তুবক্সারের যুদ্ধের পর১৭৬৫ খ্রিঃ ক্লাইভদ্বিতীয়বার ভারতবর্ষে আসলেপরিসি'তি পাল্টেযায়।
ক্লাইভ দেশ থেকেফিরে প্রথমেই পরাজিতঅযোধ্যার নবাব এবংদিল্লির সম্রাটের দিকেনজর দেন। তিনিঅযোধ্যারী পরাজিত নবাবেরসঙ্গে মৈত্রী স্থাপনকরেন। তার বিনিময়েআদায় করে নেনকারা ও এলাহাবাদজেলা দুটি। যুদ্ধেরক্ষতিপূরণ বাবদ আদায়করেন পঞ্চাশ লক্ষটাকা। অপর দিকেদেওয়ানী শর্ত সম্বলিতদুটি চুক্তি তিনিকরেন। একটি দিল্লিরসম্রাট শাহ আলমেরসঙ্গে। এতে কোম্পানিকেবাংলা, বিহার, উড়িষ্যারদেওয়ানী দান করাহয়। এর বিনিময়েছাব্বিশ লক্ষ টাকানবাব প্রতিবছর সম্রাটকেপাঠাবেন। এই টাকানিয়মিত পাঠাবার জামিনদারহবে কোম্পানি।
অপর চুক্তিটি হয়মীর জাফরের নাবালকপুত্র নবাব নাজিম-উদ-দ্দৌলারসঙ্গে। বাৎসরিক ৫৩লক্ষ টাকার বিনিময়েনবাব কোম্পানির দেওয়ানীলাভের সকল শর্তমেনে নেন। এইচুক্তিদ্বয়ের ফলে যেদেওয়ানী লাভ করাহয় তাতে এঅঞ্চলে কোম্পানির ক্ষমতাএকচেটিয়া বৃদ্ধি পায়।নবাব এখন বস'তকোম্পানির পেনশনার মাত্র।সম্রাটও তাই। সমস্তক্ষমতা কোম্পানির হাতে।দেওয়ানীর ফলে কোম্পানিরযে আয় হবেতা দিয়ে কোম্পানিরসমস্ত খরচ কুলিয়েব্যবসার সমস্ত পুঁজিসংগ্রহ করা সম্ভব।সুতরাং, দেওয়ানীর গুরুত্বসম্পর্কে বলতে হয়যে,
এক. দেওয়ানী লাভকোম্পানির শুধু রাজনৈতিকনয় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেওবিশাল বিজয়।
দুই. সম্রাট ওনবাব উভয়েই ক্ষমতাহীনশাসকে পরিণত হন।প্রকৃতপক্ষে তারা হয়েযান কোম্পানির পেনশনভোগীকর্মচারী।
তিন. দেওয়ানী লাভেরফলে এবং নবাবকর্তৃক প্রদত্ত শর্তঅনুযায়ী শুল্কহীন বাণিজ্যেরকারণে কোম্পানির কর্মচারীরাবেপরোয়া হয়ে ওঠে।তাদের অর্থ লোভদিন দিন বেড়েযেতে থাকে। ক্ষতিগ্রসতহতে থাকে দেশীয়বণিক শ্রেণি, সাধারণমানুষ। তাদের অর্থনৈতিকমেরুদণ্ড সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গেপড়ে।
চার. দেওয়ানী লাভেরফলে বাংলা থেকেপ্রচুর অর্থ সম্পদইংল্যান্ডে পাচার হতেথাকে। এর পরিমাণএতটাই ছিল যেএই অর্থের বলেইংল্যান্ডের শিল্প বিপ-বরক্ষেত্র প্রস'তহয়েছিল।
দ্বৈত শাসন
রবার্ট ক্লাইভ দেওয়ানীসনদের নামে বাংলারসম্পদ লুণ্ঠনের একচেটিয়াক্ষমতা লাভ করে।দিল্লি কর্তৃক বিদেশিবণিকী কোম্পানিকে এইঅভাবিত ক্ষমতা প্রদানেসৃষ্টি হয় দ্বৈতশাসনের। অর্থাৎ যাতেকরে কোম্পানি লাভকরে দায়িত্বহীন ক্ষমতা, নবাব পরিণত হনক্ষমতাহীন শাসকে। অথচনবাবের দায়িত্ব থেকেযায় ষোলআনা। ফলেবাংলায় এক অভূতপূর্বপ্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টিযার চরম মাসুলদিতে হয় এদেশেরসাধারণ জনগোষ্ঠীকে। ১৭৭০খ্রিস্টাব্দে (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) গ্রীষ্মকালে দেখা দেয়ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যাস্মরণকালের ইতিহাসে ছিয়াত্তরেরমন্বন্তর নামে পরিচিত।কোম্পানির মুর্শিদাবাদের প্রতিনিধিরিচার্ড বেচারের ভাষায়‘দেশের কয়েকটি অংশেযে জীবিত মানুষমৃত মানুষকে ভক্ষণকরিতেছে তাহা গুজবনয়, অতি সত্য’।এই দুর্ভিক্ষে বাংলারজনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশমৃত্যুমুখে পতিত হয়।
১৭৬৫-৭০ খ্রিঃবাৎসরিক রাজস্ব আদায়েরপরিমাণ যা ছিল, দুর্ভিক্ষের বছরও আদায়প্রায় তার কাছাকাছিছিল। ফলে চরমশোষণ নির্যাতনে বাংলারমানুষ হতদরিদ্র ওঅসহায় হয়ে পড়ে।দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় নবাবেরহাতে পর্যাপ্ত অর্থনা থাকায় প্রশাসনপরিচালনায় তিনি সম্পূর্ণরূপেব্যর্থ হন। সারাদেশেশুরু হয় বিশৃঙ্খলা।এই পরিসি'তিতে১৭৭২ খ্রিঃ ওয়ারেনহেস্টিংস দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটান।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
লর্ড কর্ণওয়ালিসকে কোম্পানিরশাসন দুর্নীতিমুক্ত ওসুসংগঠিত করতে ১৭৮৬খ্রিস্টাব্দে ভারতের গভর্নরজেনারেল ও সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দিয়েপাঠানো হয়। তিনি১৭৯৩ খ্রিঃ চিরস্থায়ীবন্দোবস্ত বা স্থায়ীভূমি ব্যবস্থা প্রবর্তনকরেন। ঐ বছর২২ মার্চ নির্দিষ্টরাজস্ব পরিশোধের বিনিময়েবাংলা, বিহার, উড়িষ্যারজমিদারগণকে নিজ নিজজমির উপর স্থায়ীমালিকানা দান করেযে বন্দোবস্ত চালুকরা হয় তাকেই‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ বলাহয়।
পটভূমি: ১৭৭২ খ্রিঃওয়ারেন হেস্টিংস রাজস্বআদায়ের জন্য পাঁচসালাবন্দোবস্ত চালু করেন।এই ব্যবস্থায় উচ্চহারেডাক নিয়ে জমিরবন্দোবস্ত নিলেও সেঅনুপাতে রাজস্ব আদায়হতো না। নির্দিষ্টসময়সীমা থাকায় জমিদাররাকৃষকদের কাছ থেকেপ্রয়োজনে নির্যাতন করেঅর্থ আদায় করত।অথচ কৃষকদের উন্নয়নবা জমির উন্নয়নেরপ্রতি তাদের কোনলক্ষ ছিল না।ফলে নির্যাতনের ভয়েকৃষকরা জমি ছেড়েপালিয়ে যেত। বছরেরপর বছর জমিঅনাবাদী থাকায় জমিরদাম কমে যেত।এ অবস্থায় হেস্টিংসজমিদারদের সঙ্গে একসালাবন্দোবস্ত চালু করেন।কিন্তু এ ব্যবস্থায়ওসরকার, জমিদার, প্রজা- কারো কোনো ধরনেরউপকার হয়নি। পরবর্তীকালেবাংলা, বিহার, উড়িষ্যাররাজস্ব সমস্যা সমাধানেরজন্য ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টনতুন ব্যবস্থা উদ্ভাবনেরপ্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে।১৭৮৪ খ্রিঃ পিটেরইন্ডিয়া এ্যাক্ট পার্লামেন্টেগৃহীত হয়। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায় স্থায়ীনিয়ম-কানুন প্রবর্তনেরমাধ্যমে দির্ঘমেয়াদি রাজস্বব্যবস্থা চালুর জন্যকোম্পানিকে নির্দেশ দেয়াহয়। ১৭৮৯ খ্রিঃকর্ণওয়ালিস জমিদারদের দশশালাবন্দোবস্ত দিতে প্রস'তিনেন। ইংল্যান্ডের কর্তৃপক্ষজমিদারদের সঙ্গে বন্দোবস্তেরঅনুমতি প্রদান করলেকর্ণওয়ালিস এই অনুমোদনেরপরিপ্রেক্ষিতে ১৭৮৯ খ্রিঃদশসালা বন্দোবস্ত চালুকরেন। তবে এরসঙ্গে এই প্রতিশ্রুতিওতিনি দেন যে, কোম্পানির ডাইরেক্টর সভারঅনুমোদন পেলে দশসালাবন্দোবস্তই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তেপরিণত হবে। ১৭৯২খ্রিঃ সেপ্টেম্বর মাসেবোর্ড অব ডাইরেক্টরসকর্তৃক অনুমোদন লাভকরে। ১৭৯৩ খ্রিঃকর্ণওয়ালিস ২২ মার্চদশসালা বন্দোবস্তকে চিরস্থায়ীবলে ঘোষণা করেন।
বৈশিষ্ট্য
- চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদেরকে জমির স্থায়ী মালিকে পরিণত করে এবং জমিদারগণ জমির মালিকানা স্বত্ব লাভ করে।
- রাজস্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়ার ফলে নিয়মিত রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে জমিদার জমিদারী ভোগের চিরস্থায়ী অধিকার লাভ করে।
- এ প্রথা চালু হওয়ার ফলে জমিদারদের প্রশাসনিক ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়। সরকার স্বয়ং শান্তি রক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
- নজরানা ও বিক্রয় ফি সমূহ বাতিল করা হয়।
- খাজনা বাকি পড়লে জমিদারদের ভূমির কিছু অংশ বিক্রি করে রাজস্ব আদায় করার ব্যবস্থা ছিল।
ফলাফল
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলারআর্থ-সামাজিক কাঠামোতেসুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।কর্ণওয়ালিস জমিদার ছিলেন।তিনি ইংল্যান্ডের মতোএদেশেও একটি জমিদারশ্রেণি গড়ে তুলতেচেয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপআর উপমহাদেশের আর্থ-সামাজিককাঠামো ও তারবিকাশের ধরন একছিল না। ফলেবাইরে থেকে চাপিয়েদেওয়া এ ব্যবস্থায়সুবিধার চেয়ে অসুবিধাইঅধিক পরিলক্ষিত হয়।
সুবিধা :
- এ ব্যবস্থার প্রধান সুবিধা হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আয় সুনির্দিষ্ট হওয়ার ফলে সরকার তার আয়ের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। যে কারণে বাজেট প্রণয়ন, বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সরকারের পক্ষে সহজ হয়।
- চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সৃষ্ট জমিদার শ্রেণি কোম্পানির একনিষ্ঠ সমর্থক হয়ে উঠে। ফলে ব্রিটিশ শাসন দৃঢ়করণ এবং দীর্ঘায়িতকরণে জমিদাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
- জমির উপর জমিদারের স্থায়ী মালিকানা স্বীকৃত হওয়ার কারণে অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় নানা ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজে ব্রতী হন। তারা নিজ নিজ এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয়, উপাসনালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়া প্রজাদের কল্যাণের জন্য রাস্তাঘাট, পুল তৈরি, পুকুর খননের মতো কাজ ছাড়াও অনেক সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁরা জড়িত হন।
- জমিদাররা জমির মালিক হওয়ার কারণে উৎসাহিত হয়ে পতিত জমি, জঙ্গলাকীর্ণ জমি চাষের ব্যবস্থা করেন। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়।
- চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সরকারকে জনপ্রিয় করে তোলে, আবার জমিদার শ্রেণি কর্তৃক সামাজিক শিক্ষা-সাংস্কৃতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখার কারণে পরিবর্তিত হতে থাকে গ্রামীণ সমাজ।
দোষ :
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলেজমিদারের স্বার্থ সুরক্ষিতহয়। তারা ধীরেধীরে ধনীক শ্রেণিতেপরিণত হয়। কিন্তুঅপর দিকে জমিতেপ্রজাদের পুরোনো স্বত্বসম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়।ফলে জমিদার ইচ্ছেকরলেই যেকোনো সময়তাদের জমি থেকেউচ্ছেদ করতে পারত।প্রথম দিকে প্রজাস্বত্বআইন না থাকায়তাদের ভাগ্যের জন্যতারা সম্পূর্ণভাবেই জমিদারেরদয়ার উপর নির্ভরকরতো।
- চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমির সঠিক জরিপের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় নিষ্কর জমির উপর বেশি রাজস্ব ধার্য করা হতো। জমির সীমা নির্ধারিত না থাকায় পরবর্তীকালে মামলা বিবাদ দেখা দিত।
- সূর্যাস্ত আইনে নির্দিষ্ট তারিখে সূর্যাস্তের মধ্যে খাজনা পরিশোধ বিধানের কঠোরতার কারণে অনেক বড় বড় জমিদারী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একমাত্র বর্ধমানের জমিদারী ছাড়া চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সাত বছরের মধ্যে অন্যান্য সব জমিদারী ধ্বংস হয়ে যায়।
- জমিদারী আয় ও স্বত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে জমিদাররা নায়েব-গোমস্তার উপর দায়িত্ব দিয়ে শহরে বসবাস শুরু করেন। এইসব অনুপসি'ত জমিদারদের নায়েব-গোমস্তাদের অত্যাচারে প্রজারা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ফলে জমির উৎপাদন কমে যেতে থাকে, গ্রামের অর্থনৈতিক অবস্থাও খারাপ হতে থাকে।
- উপমহাদেশে জমি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। ফলে নিম্নবর্ণের অনেক ব্যক্তি, সাধারণ মানুষ যারা কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে প্রচুর অর্থের মালিক হন, তারা জমিদারী কিনে আভিজাত্যের মর্যাদালাভে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। ফলে দেশীয় পুঁজি, দেশীয় শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যায়। অপর দিকে কোম্পানিও সম্ভাব্য এদেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীর হাত থেকে বেঁচে যায়।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলেকৃষকরা সরাসরি জমিদারকর্তৃক শোষিত হতেথাকে। আবার এইজমিদার শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতাপেয়ে গ্রামীণ সমাজেএকটি শিক্ষিত শ্রেণিগড়ে উঠছিল, যারাপরবর্তী সময়ে দেশ-জাতিসম্পর্কে সচেতন হয়েওঠে। একই সঙ্গেব্রিটিশ কর্তৃক সৃষ্টজমিদার শ্রেণি যারাপ্রথমদিকে ব্রিটিশ সম্রাজ্যেরশক্ত ভিত ছিল, তাদেরই পরবর্তী প্রজন্মপাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিতহয়ে ব্রিটিশ-রাজউৎখাতের জন্য স্বাধীনতাআন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।













Post a Comment