ফ্যামিলির সবচেয়ে আদরের ছেলেটির নাম ছিল তানজিল....
যাকে বলা যায় ফ্যামিলির মধ্যমণি....
যার কাছে বিলাসিতাময় জীবনই ছিল পছন্দ......
যার কাছে সব সময় গলায় স্বর্ণের চেইন, হাতে বেসলাইট, আংটি এবং ছেড়া পোশাকের পাশাপাশি আইনফোন মোবাইল ব্যবহার করার একটা প্রবনতা দেখা যেত.....
অর্থাৎ যার কাছে টাকা ছিল কাগজের মতো...
যা চাইতো, চাহিবা মাত্রই ফ্যামিলি থেকে সব কিছু পেয়ে যেতো.....
অভাব বলে পৃথিবীতে কিছু একটা আছে, সেটা সে কখনো বুঝতে শিখে নি.....
কখনো নিজ হাতে ভাত ও খায় নি....
আর সেই একদিন কোন এক কারনে বাসা ছেড়ে অনেক দূরে চলে যায়...
তারপর থেকে তানজিলকে অনেক জায়গায় খোঁজা-খুঁজি করে....
কিন্তু কোথাও ও তার সন্ধান মিলে নি....
তানজিল বাসা থেকে যাওয়ার সময় তেমন কিছুই নেয় নি, শুধু মাত্র নিজের পরনের শার্ট -প্যান্ট পড়েই চলে গেছে....
আর সচরাচর যে গুলো ব্যবহার করতো সেই গুলোই সাথে ছিল.....
আর ছিল পকেটের মধ্যে থাকা ৫০০০টাকা....
নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার জন্য ফুটপাত থেকে ৫৫০ টাকার একটা শার্ট এবং ৭০০ টাকার একটা প্যান্ট কিনে....
তারপর সেগুলো পড়ে নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে চাকুরী খোঁজতে লাগলো....
অনেক কষ্টে নিজের পরিচয় সম্পূর্ণ ভাবে লুকিয়ে, একটা রেস্টুরেন্টে চাকুরী পেলো.....
প্রথম অবস্হায় নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে প্রবলেম হলে ও, আস্তে আস্তে নিজেকে মানিয়ে নিতে লাগলো....
দীর্ঘ ১ বছর কষ্ট করার পর সেই জমানো টাকা দিয়ে আবার ইন্টারে ভর্তি হয়ে গেল....
যদি ও ইতোমধ্যে ১ বছর ড্রপ পড়ে গিয়েছে.....
তারপর থেকে তার পড়া-শোনার জীবন আবারো শুরু...
কিন্তু সেটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে....
যার জন্য ঠিকমতো ক্লাস করা তানজিলের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না....
তাই বাধ্য হয়ে তাকে নোট সংগ্রহ করতে হতো....
কিন্তু কলেজের মধ্যে সবচেয়ে নিচু মানের কাপড়-চোপড় ছিল তানজিলের, যার জন্য অন্যরা তার কাছ থেকে অনেকটা দূরে থাকতো....
কিন্তু, সুস্মিতা ছিল অন্য সবার থেকে আলাদা, যার জন্য সব সময় তানজিলের পাশে থেকে তানজিলকে বিভিন্ন ভাবে নোট দিয়ে সাহায্য করতো.....
এছাড়া টাকার জন্য তানজিল কোচিং করতে না পারলে ও, সুস্মিতা তানজিলকে সব কিছু বুঝিয়ে দিতো.....
যার জন্য সুস্মিতা হয়ে যায় তার নতুন জীবনের বেস্ট ফ্রেন্ড....
এই ভাবেই চলতে থাকে তানজিলের নতুন জীবন....
কিন্তু, যখনি দিন শেষে রাত গনিয়ে আসে, ঠিক তখনি তানজিলের মনে পড়ে যায়, এই পৃথিবীর বাহিরে যে আরেকটা জগৎ ছিল তার কথা.....
আর তখনি রাতের আঁধারে বালিশ ভিজিয়ে যায় রাতের পরে রাত.....
এই ভাবেই চলতে লাগলো তানজিলের নতুন জীবন.....
আর এভাবে চলতে চলতেই এক সময় সুস্মিতার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তানজিল সুস্মিতার প্রেমে পড়ে যায়....
কিন্তু সেটা আর বলা হয়ে ওঠে না.....
কারন, আজকে দুই জনের পৃথিবীটাই সম্পূর্ণ ভিন্ন....
যার কারনে ভালোবাসার কথাটা না বলাই রয়ে গেল.....
আর অন্য দিকে ও সুস্মিতা তানজিলকে সাহায্য করতে করতে কখন যেন তানজিলকে ভালোবেসে ফেলেছে সেটা সে নিজে ও জানে না....
সুস্মিতা ভালোবাসার কথাটি অনেক বার তানজিলকে বলতে গিয়ে ও বলতে পারে নি....
কারন, তানজিল যদি মনে করে তাকে সাহায্যের বিনিময়ে সুস্মিতা ভালোবাসা দাবি করছে.....
যার কারনে প্রতিদান হিসাবে হয়তো ভালোবাসা করুনা করতে পারে.....
তাই কারো দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমি ভালোবাসা পেতে চাই না.....
কিন্তু আমার ভালোবাসা যদি সত্যি হয়ে থাকে,।তাহলে একদিন না একদিন তানজিল আমার হবে এটাই আমার আত্মবিশ্বাস.....
আর এই সব ভাবতে ভাবতেই নিজের ভালোবাসার কথাটি বলা থেকে দূরে থাকে......
আর এদিকে তানজিল সারাক্ষন রেস্টুরেন্টে কাজ করে, তারপরে পড়া-শো চালিয়ে যেতে অনেক ক্লান্ত হয়ে যায়....
কিন্তু কিছুই করার নেই, বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হবে....
এই ভাবেই GPA-5 নিয়ে তানজিল এবং সুস্মিতা ইন্টারমিডিয়েট কমপ্লিট করে, যার সম্পূর্ণ ক্রেডিট টাই ছিল সুস্মিতার.....
কারন সুস্মিতা যদি টিচারের দায়িত্বটা পালন না করতো তাহলে হয়তো তানজিলের পক্ষে GPA 5 পাওয়া কোন দিন ও সম্ভব হতো না....
তাই রেজাল্ট পাওয়া মাত্রই তানজিল সুস্মিতাকে সুন্দর করে একটা ধন্যবাদ দিলো....
তখন সুস্মিতা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো পাগল একটা....
তারপরে আবার বলতে লাগলো....
সুস্মিতাঃ মেডিকেলের পরীক্ষা দিবে না...??
তানজিলঃ আমার তো প্রিপারেশন নেই, আর টাকার জন্য কোচিং করা ও আমার পক্ষে সম্ভব না....
কি করবো জানি না....
সুস্মিতাঃ আমি টাকা দেই তুমি কোচিং এ ভর্তি হয়ে যাও....
তানজিলঃ সরি, সুস্মিতা তুমি এমনিতেই আমার জন্য অনেক কিছু করেছো, তাই তোমার কাছ থেকে টাকা নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না.....
তুমি কোচিং করে যে সিট গুলো পাবে, সেই গুলো তুমি পড়ার পাশাপাশি আমাকে দিও, তাহলেই হবে....
সুস্মিতাঃ ওকে, আচ্ছা....
আর তানজিল তোমাকে একটা কথা বলবো....
যদি মনে কিছু না করো....
তানজিলঃ তোমার কথায় আমি কিছু মনে করতে পারি এটা ভাবলে কিভাবে.....
বলো কি বলতে চাও.....??
সুস্মিতাঃ আচ্ছা তানজিল তোমার ফ্যামিলিতে কেউ নেই....??
কথাটি শুনামাত্রই তানজিল চুপ, কিছুক্ষণ পরে রিপ্লে দিল...
তানজিলঃ আল্লাহর রহমতে আমার সবাই আছে....
সুস্মিতাঃ তাহলে তুমি তাদের সাথে কন্টাক করো না কেনো...??
তানজিলঃ সময় হলে সবই জানতে পারবে....
আর আমার কাজের সময় হয়ে গেছে, আমি আসি তুমি ভালো থেকো....
এটা বলেই সেখান থেকে তানজিল চলে আসলো...
আর এদিকে নিহাল নামের একটি ছেলে যে কিনা তানজিলের রেস্টুরেন্টে নিয়মিত কাস্টমার....
আর আজকে লাচ্ছি খাওয়ার সময় হঠাৎ করে মন খারাপ করে, আনমনে কি যেন ভাবছে নিহাল....
তানজিলঃ কি হয়েছে নিহাল ভাইয়া মন খারাপ...???
নিহালঃ হ্যাঁ ভাইয়া....??
তানজিলঃ কি হয়েছে শেয়ার করা যাবে....
নিহালঃ ভাইয়া আমার একটা চাকরি খুব দরকার, কিন্তু চাকরি পাচ্ছি না....
যেখানেই যাই ঘুষ ছাড়া কোন কথা নেই.....
তানজিলঃ এই জন্য মন খারার তাই না....
মন খারাপ করো না ভাই আল্লাহ একটা ব্যবস্হা করবেন....
আজকে আসার সময় পত্রিকার মধ্যে দেখলাম, শহরের সবচেয়ে বড় কোম্পানীতে মনে হয় লোক নিয়োগ দিচ্ছে....
সেলারি হয়তো ৭০,০০০ +......
আপনি এপ্লাই করে দেখতে পারেন....
নিহালঃ ভাইয়া এতো বড় কোম্পানীতে কি ঘুষ ছাড়া আমাদের মতো সাধারন লোকের চাকুরি হবে...??
তানজিলঃ চাকুরি হওয়া আর না হওয়া সম্পূর্ণটা আল্লাহর উপর....
সুতরাং আপনি এপ্লাই করে দেখেন কি হয়.....
নিহালঃ ওকে ভাইয়া.....
তারপরে তানজিলের কথামতো নিহাল চাকরির জন্য এপ্লাই করলো এবং পরীক্ষা দিয়ে চান্স ও পেয়ে গেলো.....
কিন্তু টাকার জন্য চাকুরিটা বুঝি আর হবে না.....
তাই ৫,০০,০০০ টাকার টেনশনে নিহাল কি করবে বুঝতে পারছে না....
অর্থাৎ এমন সময় তানজিলের সাথে দেখা হয়ে গেল....
তানজিলঃ কি ভাইয়া চাকুরির কি খবর...??
নিহালঃ চাকুরিটা বুঝি আর হবে না ভাই....
তানজিলঃ কেন ভাইয়া, কি হয়েছে বলেন তো....
নিহালঃ পরীক্ষায় আমি উত্তীর্ণ হয়েছি কিন্তু ৫,০০,০০০ টাকা ঘুষের জন্য চাকুরিটা বুঝি আর আমার হবে না....
তানজিলঃ এটার জন্য টেনশন, তাই না....
নিহালঃ হ্যাঁ ভাইয়া....
তানজিলঃ টাকা জমা দেয়ার লাস্ট তারিখ কবে....??
নিহালঃ আগামীকাল ৩টার মধ্যে জমা দিতে হবে...
তানজিলঃ ওহহ....
আচ্ছা আপনি কালকে ১০টার সময় আপনার সব কাগজ পত্র নিয়ে ম্যানেজারের কাছে চলে যাবেন, বাকিটা আমি দেখছি কি হয়....
নিহালঃ ওকে ভাইয়া....
অতঃপর তানজিলের কথামতো নিহাল সম্পূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে ম্যানেজারের কাছে গেল....
তারপর....
ম্যানেজারঃ ৫,০০,০০০ টাকা নিয়ে আসেছেন কি মি. নিহাল সাহেব...
নিহালঃ না স্যার, টাকা কালেক্ট করতে পারি নি.....
ম্যানেজারঃ তাহলে এখানে কি....??
নিহালঃ আপনার সাথে একজন দেখা করতে বলেছে....???
ম্যানেজার: কে সে....??
নিহালঃ আমি ফোন দিচ্ছি তার সাথে আপনি কথা বলেন....
তারপর নিহাল তানজিলকে ফোন দেয়...
নিহালঃ তানজিল ভাইয়া আপনার কথা মতো তো আমি ম্যানেজারের কাছে এসেছি....
কিন্তু ম্যানেজার তো আমার কাছে টাকা চাচ্ছে.....
তানজিলঃ সরি ভাইয়া আমি ভুলেই গিয়ে ছিলাম, আপনি একটু অপেক্ষা করেন আমি আমার বন্ধুকে ফোন দিয়ে সব ব্যবস্হা করে দিচ্ছি....
এটা বলেই তানজিল ফোনটি কেটে দিয়ে....
তারপর তানজিল তার নিজের সেই পুরানো আইফোন মোবাইলটি আবার অন করে ম্যানেজারকে ফোন দিল......
গল্পঃ না বলা ভালোবাসা
পর্বঃ ১
# কালেক্টেড

Post a Comment